বাংলাদেশ মঙ্গলবার 26, March 2019 - ১২, চৈত্র, ১৪২৫ বাংলা - হিজরী

কামরুল, মোজাম্মেল সংবিধান রক্ষার শপথ ভেঙেছেন

অনলান ডেস্ক: | প্রকাশিত ০২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ১২:১২:২৩

কামরুল ইসলাম ও  আ ক ম মোজাম্মেলআদালত অবমাননা মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় গতকাল বৃহস্পতিবার প্রকাশ হওয়ার পর সরকারের দুই মন্ত্রী কামরুল ইসলাম এবং আ ক ম মোজাম্মেল হক মন্ত্রী থাকতে পারেন কি না, সেই প্রশ্ন আবারও সামনে চলে এসেছে। আইনজ্ঞরা বলছেন, সংবিধান বা আইনে এ বিষয়ে সুস্পষ্টভাবে কিছু বলা না থাকলেও নৈতিক কারণে তাঁদের এই পদে থাকার সুযোগ থাকে না।
গতকাল আদালত অবমাননার দায়ে দুই মন্ত্রীর বিরুদ্ধে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। রায়ে দেখা যায়, আপিল বিভাগের আটজন বিচারপতি দুই মন্ত্রী আদালত অবমাননা করেছেন বলে সিদ্ধান্ত টানেন। আর পাঁচজন বিচারপতি বলেছেন, ওই দুই মন্ত্রীর সংবিধান রক্ষার শপথ ভঙ্গ হয়েছে। অন্য তিনজন বিচারপতি শপথভঙ্গের বিষয়টি বিচার্য ছিল না বলে উল্লেখ করেছেন। তবে শপথভঙ্গের জন্য তাঁদের মন্ত্রিত্ব থাকবে কি না, সে বিষয়ে আপিল বিভাগ কিছু বলেননি। সংবিধান বা প্রচলিত কোনো আইনে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট কিছু বলা নেই।

রায় প্রকাশ হওয়ার পর এ বিষয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এবং অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম কোনো মন্তব্য করেননি।

জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিক প্রথম আলোকে বলেন, দুটি ব্যতিক্রম ছাড়া সংবিধানের ১৫৩টি অনুচ্ছেদের কোনো একটি বিধান লঙ্ঘন করলে কী পরিণতি হবে, তা সংবিধানে বলে দেওয়া নেই। তিনি বলেন, ‘আমাদের একটি আইন আছে যেখানে বলা আছে, যারা সরকারের কর্মে নিয়োজিত, তাদের কোনো জরিমানা বা জেল হলে পদ থেকে বরখাস্ত বলে গণ্য করা হবে। এ অনুসারে জরিমানা হওয়ার পর থেকেই তাঁদের পদচ্যুত হওয়ার কথা।’

এর আগে দুই মন্ত্রীকে দোষী সাব্যস্ত করে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের আট সদস্যের বেঞ্চ গত ২৭ মার্চ রায় দেন। পাঁচ মাস পর গতকাল সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে ৫৪ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হলো।

সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ওই রায়ে বলা হয়েছে, তাঁরা (দুই মন্ত্রী) আইন লঙ্ঘন করেছেন এবং সংবিধানের রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধানে তাঁদের শপথ ভঙ্গ করেছেন। সংখ্যাগরিষ্ঠের মতের ভিত্তিতে আসা এই রায় লিখেছেন আপিল বিভাগের বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলী। তাঁর সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্‌হাব মিঞা, বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা ও বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার।

দুই মন্ত্রীকে দোষী সাব্যস্ত করে দণ্ড দেওয়ার বিষয়ে একমত হলেও তাঁদের শপথ ভঙ্গ করার বিষয়ে ভিন্নমত দিয়ে রায় লিখেছেন বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী। তাঁর সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি মো. নিজামুল হক।

গত ২৭ মার্চ আদালত অবমাননায় দোষী সাব্যস্ত করে দুই মন্ত্রীকে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা করেন আপিল বিভাগ। জরিমানার পর তাঁরা মন্ত্রী হিসেবে স্বপদে থাকতে পারেন কি না, তখন সেই প্রশ্ন উঠেছিল। গতকাল পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হওয়ার পর শপথভঙ্গের বিষয়টি উল্লেখ থাকায় মন্ত্রিত্বের বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে। এ বিষয়ে সরকারের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের কেউ আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করতে চাননি। এমনকি আইনজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞদের অনেকে বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন।

পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, রায়ের কপি পাওয়ার পর আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাবেন।

খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলামের আইনজীবী হিসেবে মামলা পরিচালনাকারী ও বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল বাসেত মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, দুই মন্ত্রী শপথ ভঙ্গ করেছেন। তবে শপথ ভঙ্গ করলে কী হবে, তা সংবিধানে বলা নেই। রিভিউ করা হবে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ইতিমধ্যে অর্থদণ্ডের অর্থ দিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এর আগে খাদ্যমন্ত্রী ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেছিলেন, তাঁরা রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদন করবেন। কিন্তু রায়ের নির্দেশনা অনুযায়ী তাঁরা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানার অর্থ শোধ করেন।

গত ২৭ মার্চ ওই রায় প্রকাশ হওয়ার পর আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছিলেন, পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হওয়ার পর তিনি এ বিষয়ে কথা বলবেন। গতকাল রায় প্রকাশ হওয়ার পর যোগাযোগ করা হলে আইনমন্ত্রী প্রথম আলোকে বলেন, রায়টি দেখে তিনি পরে প্রতিক্রিয়া জানাবেন।

জানতে চাইলে সাবেক আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক মন্তব্য করা কঠিন। তা ছাড়া দেশে এ ধরনের দৃষ্টান্ত নেই। তাই বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করতে চাইলে এটা পর্যালোচনা করতে হবে।

তবে শফিক আহমেদ বলেন, ‘দুই মন্ত্রীর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা নেই। সংবিধানেও এ বিষয়ে কিছু বলা নেই। কাজেই এর ওপর ভিত্তি করে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে বলে আমি মনে করি না।’

সাবেক আইনমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি তো মনে করি, এই বিষয়টি শুধু আইনগত নয়। এর সঙ্গে নৈতিক দিকটি গভীরভাবে জড়িত। সুতরাং তাঁদের উচিত হবে অবিলম্বে স্ব স্ব পদ থেকে পদত্যাগ করা। সেটি হবে তাঁদের জন্য উত্তম।’

গত ৫ মার্চ একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসির আদেশ পাওয়া মীর কাসেম আলীর আপিল মামলা পুনঃশুনানির দাবি জানান। ওই শুনানিতে প্রধান বিচারপতি ও রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা হিসেবে অ্যাটর্নি জেনারেলকে অংশ না নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। একই অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী মোজাম্মেল হকও প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে কিছু মন্তব্য করেন।

এর তিন দিনের মাথায় ৮ মার্চ আপিল বিভাগ জামায়াতের নেতা মীর কাসেম আলীর আপিলের রায় ঘোষণা করেন, তাতে তাঁর মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকে। ওই দিন আপিল বিভাগ দুই মন্ত্রীকে কারণ দর্শাতে বলেন এবং আদালতে হাজির হতে নির্দেশ দেন। দুই মন্ত্রী আদালতে হাজির হয়ে তাঁদের ব্যাখ্যা দাখিল করেন এবং নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেন।

পূর্ণাঙ্গ রায়: বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলী রায়ে বলেছেন, সংবিধান সুপ্রিম কোর্টকে আইন অনুযায়ী রায় দেওয়ার এখতিয়ার দিয়েছে। অথচ বিবাদীরা তাঁদের কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য সুপ্রিম কোর্টের কী সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা উচিত সে ব্যাপারে আদালতকে নির্দেশনা দেওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন। রায়ে আরও বলা হয়, সংবিধানে বর্ণিত আইনের শাসন রক্ষার যে শপথ বিবাদীরা নিয়েছেন, সে দায়িত্বের প্রতি তাঁরা (দুই মন্ত্রী) অবহেলা করেছেন। তাঁরা আইন লঙ্ঘন করেছেন। সংবিধান সংরক্ষণ ও সুরক্ষার শপথ ভঙ্গ করেছেন।

রায়ে বলা হয়েছে, বিবাদীরা (দুই মন্ত্রী) ন্যায়বিচার প্রদানের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিচার বিভাগের পবিত্রতাকে হেয় করেছেন। তাঁরা উদ্দেশ্যমূলকভাবে কথাগুলো উচ্চারণ করেছেন এবং তাঁদের দোষ স্বীকার করেছেন।

রায়ে আরও বলা হয়, সংবিধান অনুসারে সবাই আইন মানতে বাধ্য, সংবিধান অনুসারে সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্ত আইন হিসেবে গণ্য হবে এবং সকলের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য। আদালতের রায়কে প্রভাবিত করতে বিবাদীরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সুপ্রিম কোর্ট নিয়ে কুৎসা রটিয়েছেন। এটা গুরুতর ফৌজদারি অবমাননা ও সংবিধানের লঙ্ঘন। এই অবমাননাকারী কোনো সহানুভূতি পেতে পারেন না।

বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলীর দেওয়া রায়টি পড়ার কথা উল্লেখ করে বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী তাঁর রায়ে বলেছেন, ‘অবমাননাকারীদের (দুই মন্ত্রী) দোষী সাব্যস্ত করা ও দণ্ড প্রদানের বিষয়ে দ্বিমত পোষণের প্রশ্ন থাকতে পারে না। কিন্তু আমি অবমাননাকারীদের “শপথ লঙ্ঘন” অংশের সঙ্গে একমত পোষণ করতে পারছি না।’

এর পক্ষে যুক্তিতে বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী রায়ে বলেছেন, ‘অবমাননাকারীরা তাঁদের শপথ ভঙ্গ করেছেন বা করেননি—এখানে তা বিচার্য বিষয় ছিল না। ওই বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য অবমাননাকারী-বিবাদীদের প্রতি কোনো নোটিশ ইস্যু করা হয়নি, যাঁরা মন্ত্রিসভার সদস্য। তাঁর মত হচ্ছে, বিবাদীদের উদ্ধৃত করে সংবাদপত্রে যে বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছে, এর মাধ্যমে তাঁরা এই আদালতের প্রতি কোনো ধরনের অবমাননা করেছেন কি না, সেটি ছিল আমাদের বিবেচনার বিষয়।’

গতকাল এই রায় প্রকাশ হওয়ার পর প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘রায়টি এখনো পড়া হয়নি। এখনই মন্তব্য করতে পারছি না।’

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিক প্রথম আলোকে বলেন, শপথ ভঙ্গ করার পর সাংবিধানিক পদে কোনো ব্যক্তির এক মুহূর্ত থাকার নৈতিক ও সাংবিধানিক অধিকার নেই। শপথভঙ্গ ও দোষী সাব্যস্ত হয়ে জরিমানা হওয়ার কারণে এখন এই দুই মন্ত্রীর সাংবিধানিক পদে থাকার নৈতিক, সাংবিধানিক ও আইনি অধিকার নেই।

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. কামাল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, শপথের গুরুত্বটা যিনি শপথ নেন তাঁকে অবশ্যই বুঝতে হবে। শপথ হলো সারা জাতির সামনে প্রতিশ্রুতি দেওয়া যে আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করব আইন ও সংবিধান মেনে। এমনই বলা আর শপথ করার মধ্যে পার্থক্য হলো দায়িত্ব নিয়ে বলা। প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা রক্ষা করা হয়নি, এর অর্থটা নিজেরই বোঝা উচিত যে তা নিজের কত বড় ব্যর্থতা। এই ব্যর্থতা যদি উপলব্ধি করেন, তাহলে তাঁর নিজেরই সিদ্ধান্ত নিতে হয়।


footer logo

 ঢাকা অফিস
GA-99/3  Pragati sharani
Gulshan Dhaka 1212
ই-মেইল:- info@bdnationalnews.com

.