বাংলাদেশ বৃহস্পতিবার 23, May 2019 - ৯, জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৬ বাংলা - হিজরী

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশের পর এমপি পুত্র রুমন গ্রেফতার

প্রকাশিত ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ১৬:০৪:২৯

 স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশের পর গ্রেফতার হয়েছেন সাতক্ষীরার এমপি পুত্র রাশেদ সরোয়ার রুমন। জানা গেছে কিছুদিন আগে স্থানীয় এক স্বর্ণ ব্যাবসায়ির করা মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।
বেলা পৌনে ২টার দিকে সাতক্ষীরার কপোতাক্ষ ফিলিং স্টেশনের সামনে থেকে তাকে গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশের একটি দল। এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তাকে ডিবি কার্যালয়ে রাখা হয়েছে।
এর আগে রোববার সকালে সাতক্ষীরার সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য রিফাত আমিনের পুত্র রাশেদ সরোয়ার রুমনকে গ্রেফতার করতে নির্দেশ দেয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
রোববার বেলা পৌনে ১২টার দিকে সাতক্ষীরা পুলিশের এসপিকে এই নির্দেশ দেয়া হয়।
জানা গেছে, স্বরাষ্টমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সাতক্ষীরার পুলিশ সুপারকে মুঠোফোনের মাধ্যমে বেপরোয়া এমপিপুত্রকে যেকোন মূল্যে গ্রেফতার করার নির্দেশ দেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পুলিশ সুপারকে বলেন, এমপিপুত্র হোক আর   যেই হোক সে অপরাধী এবং তার বিরুদ্ধে অনেকগুলো মামলা আছে কাজেই তাকে গ্রেফতার করেন। তার কারণে আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তী নষ্ট হচ্ছে, একজন অপরাধীর কারণে আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তী নষ্ট হবেÑ এটা হতে পরে না। কাজেই আপনি দ্রুত তাকে গ্রেফতার করবেন এবং আমাকে জানাবেন।
রুমনের কার্যকলাপ :
বহু ঘটন-অঘটনের নায়ক সংরক্ষিত মহিলা আসন (৩১২) এর সাংসদ রিফাত আমিনের পুত্র রাশেদ সরোয়ার রুমন।
জানা গেছে, শহরের উপকণ্ঠের মাগুরা এলাকার ধর্ণাঢ্য স্বর্ণ ব্যবসায়ী মিলন পাল ওরফে গোল্ডেন মিলন একটি সোনা চোরাচালানী মামলায় যখন জেলহাজতে অন্তরীণ ঠিক তখনই তার সম্পদ লুণ্ঠনে আদাজল খেয়ে মাঠে নামে রুমন। ইতিমধ্যে মিলন পালের গরু, স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকাসহ পঞ্চাশ লক্ষাধিক টাকার সম্পদ লুটপাট করেছেন তিনি। সর্বশেষ কারাগারে অন্তরীন মিলনের নিকট থেকে স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেয়ার চেষ্টাও করেছেন তিনি।
গত মঙ্গলবার সকালে সবাই যখন ঈদুল আযহার নামাজ পড়তে ঈদগাহে, ঠিক তখনই সুযোগ বুঝে সাংসদ মিসেস রিফাত আমিন ও তার ছেলে রাশেদ সরোয়ার রুমনসহ কয়েকজন মিলন পালের মাগুরার বাগানবাড়িতে যান। সাংসদের উপস্থিতিতে বাড়ির গেটের তালা ভাঙা হয়। পরে তারা ভেতরে ঢুকে বিভিন্ন কাগজপত্র ছাড়াও নগদ টাকা ও স্বর্নালংকার নিয়ে যান। প্রত্যক্ষদর্শীরা আরো বলেন সেখানে রাখা একটি অস্ত্রও নিয়ে যান তারা।
গ্রামবাসীকে এ সময় সাংসদ রিফাত আমিন বলেন, ‘আমি এসপি সাহেবের অনুমতি নিয়ে এসেছি’। তাছাড়া ওসিকে ঢাকা থেকে আওয়ামী লীগের এক প্রভাবশালী নেতা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বলেও দিয়েছেন’।
তবে সাতক্ষীরার পুলিশ সুপার আলতাফ হোসেন এবং ওসি ফিরোজ হোসেন মোল্লা দুজনই বলেন ‘এটা মিথ্যা কথা। আমরা কাউকে এ ধরনের কাজের অনুমতি দেইনি’।
মিলন পরিবারের দাবি, মিলন জেলে রয়েছে এই সুযোগে তাদের  শহরতলির মাগুরা  গ্রামের বাগানবাড়ির সম্পদ লুটপাট শুরু হয়েছে। কয়েকদিন আগে রুমন বাগানবাড়ির খামারের ১৩ টি নেপালি জাতের মূল্যবান গরু ধরে নিয়ে গেছেন। ঈদ উপলক্ষে এর দুটি নিজেদের জন্য রেখে বাকি ১১ টি গরু বিক্রি করে দিয়েছেন। একই দিনে রুমনের কথিত স্ত্রী বেলী পুলিশের উপস্থিতিতে মিলনের প্রাইভেটে কারের গ্লাস ভেঙে জিনিসপত্র বের করে নিয়ে যায়। মিলনের বাবা দেবদাস পাল বলেন, মিলনকে মুক্ত করানোর নামে রুমন তার মার কথা বলে তাদের কাছ থেকে ২০ লাখ টাকা নিয়েছেন। এরপর আরও দশ লাখ টাকা দাবী করে রুমন। এই টাকা না দিতে পারলে তার বদলে প্রাইভেট কারটিও চান তিনি।
এসব  বিষয়ে জানতে সাংসদ মিসেস রিফাত আমিনের সাথে সোমবার রাতে ও মঙ্গলবার সকালে দুই দফা কথা হয়। তিনি বলেন ‘আমার বিরুদ্ধে এসব অপপ্রচার। আমি এখন আওয়ামী লীগের জন্য অনেক কাজ করছি। তার জন্য আওয়ামী লীগের কিছু লোক সহ্য করতে পারছেন না। তাই তারা এসব অপপ্রচার করছে। আমি ভাবছি, প্রধানমন্ত্রীকে বলে এদের সাইজ করে দেবো’।
মঙ্গলবার বিকেলে রাশেদ সরোয়ার রুমন কারাগারে আটক মিলন পালের সাথে দেখা করতে যান। সেখানে তার কাছে ২৫০ টাকার একটি সাদা স্ট্যাম্প ধরে তাতে স্বাক্ষর দেওয়ার কথা বলেন। বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে আসতেই তা কেড়ে নেন কারারক্ষীরা। জব্দ করেন স্ট্যাম্পটি। অজ্ঞাত ওই যুবককে জেল গেট থেকে দ্রুত সরিয়ে দেন তারা।
জেল সুপার আবু জাহেদ জানান ‘কয়েকদিন আগে নারী সাংসদ মিসেস রিফাত আমিন টেলিফোনে তাকে অনুরোধ করেছিলেন স্ট্যাম্পে মিলনের সই করিয়ে দিতে। এজন্য স্ট্যাম্পসহ পুত্র রুমনকেও পাঠিয়েছিলেন’। সুপার বলেন ‘এটা আইনসিদ্ধ নয়। কেবলমাত্র জেলা ম্যাজিস্ট্রেট অথবা সংশ্লিষ্ট কোনো আদালতের নির্দেশনা ছাড়া সই করানো বেআইনি, কারাবিধির লংঘন’। তিনি জানান ‘আমি রুমনকে ফেরত পাঠিয়েছিলাম’।
এ প্রসঙ্গে মিলনের স্ত্রী শম্পা বলেন ‘তারা এখন নতুন ফন্দিতে জেলে থাকা আমার স্বামীর সই স্বাক্ষর নিয়ে আমাদের সম্পদ হাতিয়ে নেওয়ার পাঁয়তারা করছেন। এ কারণেই জেল থেকে সই আনার চেষ্টা করেছেন তারা’।
এর আগে, গতরোববার রাতে এক আওয়ামী লীগ নেতাসহ চারজনকে মারপিট করে সংবাদ শিরোনাম হন রুমন। ওই রাতেই রুমন সাতক্ষীরার ভোমরায় নিজের গাড়ি দুর্ঘটনায় পড়ে অজ্ঞাত স্থানে চলে যান। তাকে নিয়ে আবারও শুরু  হয়ে যায় হই চই।
সোমবার দুপুরে খোঁজ মিললো সেই রুমনের। দুর্ঘটনা কবলিত গাড়িটি ফেলে রেখে  তিনি রাতে এক নারীসহ শহরের মাগুরার বউ বাজারের ধারে বাঁশতলার  সোনা চোরাচালানি মিলন পালের বাগান বাড়িতে আড্ডা দেন। সকালে এ খবর জানাজানি হতেই গ্রামবাসী বাড়ি ঘিরে গনপিটুনি দিয়েছে তাকে।
লাবসা ইউপি সদস্য আবদুল হান্নান জানান সকালে জানাজানি হয় যে রুমন এক নারীসহ তার এলাকার মিলন পালের  বাগান বাড়িতে  অবস্থান নিয়েছেন। তার বন্ধু মিলন বর্তমানে সোনা চোরাচালান মামলায় জেলে আটক রয়েছেন । তিনি বলেন খবর পেয়ে সেখানে যেতেই দেখি কাটিয়া এলাকার বহু মানুষ। তারা রুমনকে খুঁজছেন। রুমন মারপিটের ভয়ে রুমের ভেতর থেকে তালা লাগিয়ে দেন। তিনি আরও জানান খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ আসে। পুলিশও সাধ্যমত চেষ্টা করে রুমনকে রুম থেকে বের করার।  কিন্তু ব্যর্থ হয়।
আবদুল হান্নান জানান এর কিছু সময় পর জেলা যুবলীগ নেতা আবদুল মান্নান পৌছান সেখানে । সাথে ছিলেন সাবেক ছাত্রলীগ নেতা এড. তামিম আহমেদ সোহাগ ও যুবলীগ পৌর কমিটির আহবায়ক মনোয়ার হোসেন অনু। তারা তাকে রুম থেকে বের করতেই শুরু হয়ে যায়  এলোপাতাড়ি গনপিটুনি। গ্রামবাসী রুমনকে  পিটিয়ে রক্তাক্ত করে। এ সময় রুমন মাটিতে পড়ে যান। তাকে দ্রুত উদ্ধার করে আহত অবস্থায় মোটর সাইকেলে নিয়ে যান যুবলীগ নেতা আবদুল মান্নান। সাথে অজ্ঞাত সেই তরুনিকেও। গ্রামবাসী জানান আবদুল মান্নান তাদেরকে চোখ রাঙ্গিয়ে শাসিয়েছেন। এ ব্যাপারে কথা না বলতেও হুমকি দিয়েছেন তিনি ।
 
বিষয়টি সম্পর্কে  জানতে চাইলে  রুমনের আদর্শিক গডফাদার সন্ত্রাস জগতের অন্যতম চাঁই  জেলা যুবলীগ  সভাপতি  আবদুল মান্নান  ওরফে হাতকাটা মান্নান বলেন   ‘ তাকে আমরা উদ্ধার করে  নিয়ে এসেছি। এখন সে কোথায় তা আমার জানা নেই। তবে মারপিট একটু আধটু হয়েছে বৈকি। তা এসব নিয়ে না লিখলে হয় না’ ?
সাতক্ষীরা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফিরোজ হোসেন মোল্লা জানান ‘ রোববার রাতে যুবলীগ নেতা জুলফিকার রহমান উজ্জ্বলকে  হত্যার উদ্দেশ্যে  মারপিটের ঘটনায়  রুমনকে প্রধান আসামি করে থানায়  মামলা হয়েছে। এই মামলায় তাকে গ্রেফতারের জন্য এসআই রফিক ও এএসআই পাইক দেলোয়ারকে পাঠানো হয় মাগুরা বাঁশতলার সেই মিলন পালের  বাগানবাড়িতে। কিন্তু সেখানে তাকে পাওয়া যায়নি’।
এদিকে  মিলন পালের স্ত্রী শম্পা রানী পাল সোমবার  সকালে এসে রুমনকে  বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবার কথা বলেন। কিন্তু রুমন তা শোনেন নি। তিনি এসময় গ্রামের লোকজনকে বিষয়টি জানান।  শম্পা অভিযোগ করে বলেন ‘ আমার স্বামী মিলন পাল জেলে রয়েছেন। আমিও কিছুদিন বাবার  বাড়িতে থাকছি। এই সুযোগে রুমন আমার বাড়িতে এসে কমপক্ষে ১৩ টি গরু বিক্রি করে দিয়েছে। যার দাম প্রায়  ১৩ লাখ টাকা’। এ ছাড়া আমার স্বামীকে জেল থেকে মুক্ত করার নামে নগদ ২০ লাখ টাকা নিয়েছে রুমন। আরও দশ লাখ টাকা না হলে মিলনের প্রাইভেট কারটি দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন রুমন’। শম্পা আরও জানান রুসনকে বের করে নিয়ে যাবার পর তিনি  বাড়িতে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছেন  ।
এদিকে রাশেদ সরোয়ার রুমনের এসব ঘটনা সম্পর্কে জানতে  চাইলে  তার মা সাতক্ষীরার সংরক্ষিত আসন ৩১২ এর সংসদ সদস্য মিসেস রিফাত আমিন বলেন ‘ রুমন সেখানে যাবে কেনো। সেতো বাড়িতেই আছে। কারা তার সম্পর্কে এসব অপপ্রচার করে বলেন তো। সে তো উজ্জ্বলের সাথে মারামারিও করেনি। মারামারি করেছে যুবলীগের মান্নান গ্রুপ আর উজ্জ্বল গ্রুপ। এ নিয়ে  আমার ছেলের বিরুদ্ধে আবার মামলা কিসের। তাছাড়া কারও বাগানবাড়িতে যাবার কথাও সত্য নয়। এগুলি অপপ্রচার মাত্র’।
প্রসঙ্গত, সংরক্ষিত সংসদ সদস্য রিফাত আমিনের ছেলে রাশেদ সরোয়ার রুমনের বেপরোয়া কর্মকা- নিয়ে ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’ রোববার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
পত্রিকাটির প্রতিবেদন ছিল এমন- দিনেদিনেই বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলেন সংরক্ষিত সংসদ সদস্য রিফাত আমিনের ছেলে রাশেদ সরোয়ার রুমন। তার কার্যক্রম এখন সাতক্ষীরা শহরের এখানে সেখানে আলোচ্য বিষয়। অতীতে বিভিন্ন অপরাধে জড়ানো রুমন ঈদুল আজহার ছুটির আগে-পরে জড়িয়েছেন সিরিজ ক্রাইমে। কখনো মাতলামি, কখনো কমান্ডো স্টাইলে বাহিনী নিয়ে দলীয় নেতাদের মারধর, কখনো আবার চাঁদাবাজি থেকে শুরু করে অন্যের বাড়িতে জোরপূর্বক ঢুকে সম্পদ লুণ্ঠন, কখনো নারী নিয়ে ফুর্তি করার সময় গণধোলাই, এসব ঘিরেই তিনি এখন সাতক্ষীরা শহরে ‘হট টপিক’।
এ ছাড়া তার অত্যাচারে শহরবাসী অতিষ্ঠ। তবে দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, পুলিশ প্রশাসনের নীরবতা আর এমপি মায়ের আশকারা পেয়ে রাশেদ সরোয়ার রুমনের ভঙ্গি হয়েছে ‘রুখবে আমারে কে!’ পুলিশ রুমনকে ‘পলাতক’ উল্লেখ করে গ্রেফতারের জন্য অভিযান চালাচ্ছিল বলে আগে জানানো হয়েছিলো। অথচ সাতক্ষীরা সদর থানার বিপরীতে মাত্র ১০ হাত দূরেই রুমনের বাড়ি নিয়মিত যাতায়াত করছেন রুমন। কিন্তু পুলিশ তাকে খুঁজে পাচ্ছে না।
আওয়ামী লীগ দলীয় নেতা-কর্মী ও সরেজমিন স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সাতক্ষীরা এলজিইডির টেন্ডার কব্জায় নিয়ে অর্জিত কয়েক লাখ টাকার ভাগাভাগি নিয়ে ১১ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় সাতক্ষীরা পৌরসভা চত্বরে জেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি ও বর্তমানে উপজেলা আওয়ামী লীগ সদস্য জুলফিকার রহমান উজ্জ্বলকে লোহার রড ও হাতুড়ি দিয়ে পেটান রুমন ও তার সহযোগীরা। হামলা ঠেকাতে গিয়ে আহত হন উজ্জ্বলের সহযোগী মিলন, কালাম, ফারুক, সালামসহ কয়েকজন। তাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
১২ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরা সদর থানায় মামলা হলেও পুলিশ রুমন বা তার কোনো সহযোগীকে শনিবার পর্যন্ত গ্রেফতার করেনি। মারধরের ওই ঘটনার ঠিক ঘণ্টাখানেক পরে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় একটি মিনি পাজেরো চালিয়ে ভোমরা স্থলবন্দরের দিকে যাওয়ার পথে দুর্ঘটনায় পতিত হন রুমন। এতে তিনি অক্ষত থাকলেও গাড়িটি দুমড়ে মুচড়ে যায়। বিধ্বস্ত অবস্থায় গাড়িটি ফেলে তিনি আরেকটি গাড়ি নিয়ে চলে আসেন শহরতলির মাগুরায় ব্যবসায়ী মিলন পালের বাগানবাড়ি। মিলন পাল সোনা চোরাকারবারি হিসেবে পরিচিত। তার বাগানবাড়িতে এক নারীকে নিয়ে রাত কাটানোর পর ঈদের আগের দিন সকালে রুমনের অবস্থান জানাজানি হলে যুবলীগ নেতাকে মারধরের প্রতিশোধ নিতে গ্রামবাসী তাকে ঘিরে ফেলে। একপর্যায়ে জেলা যুবলীগ সভাপতি আবদুল মান্নান, অ্যাডভোকেট তামিম আহমেদ সোহাগ ও পৌর যুবলীগ আহ্বায়ক মনোয়ার হোসেন অনু তাকে উদ্ধার করতে যান। এ সময় গণপিটুনিতে গুরুতর আহত হন এমপিপুত্র রুমন ও তার প্রেমিকা। পরে ঈদের আগের রাত ৮টার দিকে রুমন নিজে ও তার মা মিসেস রিফাত আমিন এমপি মিলন পালের তালাবদ্ধ বাগানবাড়িতে ঢোকার চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে গেট ভাঙচুর করেন।
পরদিন মঙ্গলবার সকাল ৭টার দিকে সবাই যখন ঈদের নামাজ নিয়ে ব্যস্ত তখন রুমন নিজস্ব বাহিনী নিয়ে এসপি ও ওসির নাম ভাঙিয়ে হামলে পড়েন মিলন পালের বাগানবাড়িতে। তারা তালা ভেঙে গেট খুলে বাড়িতে রাখা এমপির লাইসেন্সকৃত একটি পিস্তল বের করে আনেন। পিস্তলটি রবিবার রাতে ভোমরা দুর্ঘটনার পর বাগানবাড়িতে নিয়ে রেখেছিলেন রুমন। এর আগে রুমনের স্ত্রী বেলী মিলনের লক করা প্রাইভেট কারের গ্লাস ভেঙে ভিতর থেকে টাকা নিয়ে যান।
এ ছাড়া কয়েক দিনের ব্যবধানে মিলন পালের বাড়ির খামারের ১৩টি বিদেশি উন্নত জাতের মূল্যবান গরু লুট করেন রুমন। এমনকি কারাগারে আটক মিলনকে ছাড়াতে এর আগে ২০ লাখ টাকাও নিয়েছেন রুমন। মিলনের স্ত্রী শম্পা রানী পাল জানান, ‘মিলন পাল ১৬ কেজি সোনা চোরাচালান মামলায় জেলে আটক রয়েছেন। এই সুযোগে তার সম্পদ লুটপাটের পাঁয়তারা করছেন রুমন।’ পরে ঈদের দিন রুমন তার এক বন্ধুকে পাঠান সাতক্ষীরার কারাফটকে। সেখানে সাক্ষাতের নামে বন্দী মিলন পালের কাছ থেকে ২৫০ টাকার সাদা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষরের জন্য জবরদস্তি করেন রুমনের বন্ধু। কিন্তু কারা কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিতে আসায় ‘কাজ’ হয়নি।
কারাগারের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ‘এ ঘটনার কয়েক দিন আগে সই নেওয়ার জন্য রুমন এসে কয়েক ঘণ্টা ধরে কারাফটকে চাপ সৃষ্টি করেন। কিন্তু আইনানুযায়ী এভাবে আদালতের অনুমোদন ছাড়া স্বাক্ষর সম্ভব নয় বিবেচনায় সেদিন তাদের স্বাক্ষর নিতে দেওয়া হয়নি। এরপর ঈদের দিন কারাগারে কম উপস্থিতির সুযোগে চুপিসারে স্বাক্ষরের চেষ্টা চালান রুমনের পাঠানো লোকজন।’
স্থানীয়দের তথ্যমতে, এখন মিলন পালের বাগানবাড়ি ও সম্পদ দখলের চেষ্টা করছেন রুমন। অথচ আড়াই মাস আগেও এই সোনা চোরাকারবারির পক্ষেই কাজ করেছেন রুমন। সে সময় মিলন পালের পক্ষ নিয়ে সাহেব আলী নামের এক গরু ব্যবসায়ীকে লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে জখম করেন। এর কিছুদিন আগে তার মায়ের ব্যবহৃত জাতীয় সংসদের স্টিকারযুক্ত গাড়িসহ শ্যামনগরের বর্ষা রিসোর্টের ১০৪ নম্বর রুমে একই সঙ্গে তিন তরুণীকে নিয়ে অসামাজিক কাজে লিপ্ত থাকা অবস্থায় শ্যামনগর থানার পুলিশ তাকে আটক করে থানায় নিয়ে আসে। পুলিশ ওই সময় সেই রুম থেকে এমপির ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্র ও ২০ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করে। জব্দ করা হয় জাতীয় সংসদের স্টিকারযুক্ত গাড়িটিও। এ সময় ছেলে রুমনকে ছাড়াতে এমপি মা রিফাত আমিন নিজেই চলে যান পুলিশের কাছে।
অভিযোগ আছে যে, ওখানে পুলিশকে ধমকিয়ে চাপ সৃষ্টি করায় পুলিশ নামমাত্র মোটরযান আইনে একটি মামলা দিয়ে তাকে জেলহাজতে পাঠায়। এরপর বেশ কিছুদিন জেল খেটে সম্প্রতি মুক্তির পর ফের শুরু করেছেন নানান সন্ত্রাসী কর্মকা- থেকে টেন্ডারবাজি।
সাতক্ষীরা সদর থানার ওসি ফিরোজ হোসেন মোল্লা বলেন, ‘রুমনের বিরুদ্ধে যুবলীগ নেতাসহ কয়েকজনকে হত্যাচেষ্টায় মারধরের মামলা রয়েছে। তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।’
রিফাত আমিন এমপি বলেন, ‘আমার ছেলে কোথাও যায়নি, সবই অপপ্রচার। আওয়ামী লীগের কিছু লোক ঈর্ষান্বিত হয়ে আমার ও রুমনের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা করছে। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়ে তাদের সাইজ করার ব্যবস্থা করে দেব।’
রাশেদ সরোয়ার রুমন বলেন, ‘আমি কোনো অঘটন ঘটাইনি।’ মিলন পালকে ছাড়াতে তিনি ২০ লাখ টাকা নিয়েছেন বলে যে অভিযোগ উঠেছে তাও সত্য নয় বলে দাবি রুমনের।


footer logo

 ঢাকা অফিস
GA-99/3  Pragati sharani
Gulshan Dhaka 1212
ই-মেইল:- info@bdnationalnews.com

.